ওড়ো অবাধে হয়ে অবাধ্য
        অর্জিত হোক যা কিছু অসাধ্য...

প্রথম লেকচারের লিংক:- ফটোগ্রাফী: ভূমিকা

দ্বিতীয় লেকচারের লিংক:- ফটোগ্রাফী: ক্যামেরা

তৃতীয় লেকচারের লিংক:- ফটোগ্রাফী: লেন্স

চতুর্থ লেকচারের লিংক:- ফটোগ্রাফী: এক্সপোজার

পঞ্চম লেকচারের লিংক:- ফটোগ্রাফী: কম্পোজিশন এবং মুহুর্ত  ১

ষষ্ঠ লেকচারের লিংক:- ফটোগ্রাফী: কম্পোজিশন এবং মুহুর্ত – ২

সপ্তম লেকচারের লিংকঃ- ফটোগ্রাফী লেকচার ৭: পর্যবেক্ষন এবং চিন্তার প্রয়োগ

 

বেসিক ফটোগ্রাফীর বিষয়ে এটাই শেষ লেকচার। এই লেকচারে টেকনিক্যাল কোন জারগন থাকছেনা, থাকছেনা রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাওয়ার কোন টিপস-ট্রিকস। নিজের কিছু চিন্তা-ভাবনা শেয়ার করবো এই লেকচারে শুধু।

শুরু করছি ছবি দিয়ে গল্প বলা বিষয়ে। ফটোগ্রাফী যদি ভালবাসেন এবং অনলাইন-অফলাইনে ছবি দেখেন, তাহলে কয়েকটি নিদৃষ্ট ‘ট্রেন্ড’ চোখে পড়বে আপনাদের। ফটোগ্রাফাররা কয়েকভাবে তাদের কাজ উপস্থাপন করে থাকেন – সেগুলো নিয়ে আলোচনা করছি:

A. সিঙ্গেল ইমেজ: যখন শুধু একটি ফ্রেম এর মাধ্যমে কোন ঘটনাকে তুলে ধরা হয়। Single image ফটোসাংবাদিকদের ‘Bread and Butter’। শখের ফটোগ্রাফাররাও বেশিরভাগ সময় single image ই তুলে থাকেন। একটি জাতীয় বা আন্তর্জাতিক খবরের সাথে সম্পর্কিত একটা বা দু’টো ছবি সব পত্রিকাই প্রকাশ করে থাকে। এই সব ক্ষেত্রে Single Image এর কাজ হলো পাঠকের সামনে ঘটনার গুরুত্বের একটা ভিজ্যুয়াল testimony উপস্থাপন করা – লঞ্চডুবিতে হতাহতের ঘটনা’র লিখিত অ্যাকাউন্টের সাথে সম্পর্কিত একটি ছবি পাঠকের কাছে ঘটনার গুরুত্ব অনেক বাড়িয়ে দেয়। সাংবাদিকতা পেশায় Single Image ঘটনার একটা ডকুমেন্টেশন, এবং অবশ্যই ছবিতে ক্যাপশন থাকতে হবে। ক্যাপশন ছাড়া এইধরনের ছবির মর্মোদ্ধার অনেকসময় পাঠকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কাজেই এই ধরনের ছবি তখনই গুরুত্বপূর্ণ যখন তা উপস্থাপিত হয় কোন বিস্তারিত খবরের context এ।

ছবি দিয়ে গল্প বলার কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে, ‘গল্প কি’, এই প্রশ্ন। আমার মতে ছবি দিয়ে গল্প বলার মূল শর্ত হচ্ছে emotional connection তৈরী করা। মানুষ হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই কিন্তু এক জীবনে বহু ভূমিকায় অভিনয় করে থাকি। আমরা প্রত্যেকেই জানি বিভিন্ন অনুভূতির স্বরুপ – আনন্দ, দুঃখ, উচ্ছাস, উদ্বেগ, রাগ, ক্রোধ, মায়া – সবকিছু। আমরা প্রত্যেকেই জীবনে মুখোমুখি হয়েছি বহু ঘটনা বা দূর্ঘটনা’র। কোন এক অজ্ঞাত কারণে আমরা নিজেদের এইসব আবেগ অনুভূতিকে সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকি এবং মনে করি আমাদের আনন্দ-বেদনা’র কাব্য একান্তই ব্যক্তিগত। একটা ভাল ছবি আমাদের এই ধারনা প্রতিনিয়ত বদলে দিতে থাকে। কোন ছবিতে যখন একটি শিশুর হাসিমুখ দেখি কিংবা একটি মায়ের কান্নাভেজা মুখ, তখন আমরা বুঝতে পারি এই দুঃখ বা আনন্দ আমার একার কোন কিছু নয়, তা সার্বজনীন। যেই ছবি দেখার পর আপনার মনে হয় ছবিটা অনেক শার্প, ছবিতে অনেক রং, দালানটা অনেক সুন্দর, আলোর ব্যবহার সুন্দর – এবং তার পর আর কিছু মনে হয় না সেটি সুন্দর ছবি, কিন্তু সফল নয়। যেই ছবি এইসব টেকন্যিকাল বিষয়ের সীমা ছাড়িয়ে আপনার অনুভূতির মর্মমূলে নাড়া দেয়, সেটিই সফল ছবি। আমার ধারণা সেইসব ছবিই আমাদের মনে ‘ধরে’, যেগুলো আমাদেরকে ব্যক্তিগত অনুভূতির মুখোমুখি করিয়ে দেয়। দেয়ালে ঝুলে থাকা যেই ছবিটি দেখে আপনি কিছুক্ষনের জন্য হলেও থমকে দাড়িয়েছিলেন, আপনার মুখ কুকড়ে উঠেছিল হাসিতে কিংবা বেদনায় – সেটিই সফল ছবি।

কাজেই টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে কান্নাকাটি করা বাদ দিন, যখন তখন গিয়ার আপগ্রেড করার চিন্তাও বাদ। যা আছে, সেটা দিয়েই ছবি তুলুন। ছবিটা তোলার আগে ভাবুন সেটা আপনার হৃদয়কে সামান্য হলেও নাড়া দিয়েছিল কিনা। যদি দিয়ে থাকে, তাহলে সেটা অন্য অনেকের হৃদয়কেই নাড়া দিতে বাধ্য। মনে রাখবেন, হৃদয় জিনিসটা universal, আপনার, একজন রিকশাওয়ালার আর একজন মিলিয়নারের হৃদয়ের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই।

B. ফটো স্টোরি/ফটো সিরিজ: ফটো স্টোরি/সিরিজ ব্যপারটা তুলনামূলক ভাবে জটিল। একটি বিষয়কে বেশ কয়েকটি পরস্পর সম্পর্কিত ফ্রেম এর মাধ্যমে তুলে ধরাটা হলো মূল বিষয়। ফটোস্টোরি করার জন্য সবচেয়ে জরুরী হলো গল্পের বিষয়বস্তু ঠিক করা। আপনি কি বলতে চান? কেন বলতে চান? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা থাকলে তবেই একটি ফটোস্টোরির কাজে হাত দিন। ফটোস্টোরি সম্পর্কিত আলোচনা কয়েকটি পয়েন্টের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছি –

১. একটি নিদৃষ্ট Theme কেন্দ্রিক ফটোস্টোরি হতে পারে। গল্পের একটি কেন্দ্রীয় উপপাদ্য থাকবে, যেটিকে আপনার সিরিজের ছবিগুলো পূনঃপৌনিক ভাবে support বা justify করবে। ধরুন আপনার ইস্যু হলো শিশুশ্রম। শিশুশ্রমের ভয়াবহতা বোঝাতে আপনি আলাদা আলাদা শিশুশ্রমিকের ছবি, তাদের কাজের ঝুকিঁ ইত্যাদি পৃথক ফ্রেম এ তুলে আনলেন। সবগুলো ছবি হয়তো আপাতদৃষ্টিতে সম্পর্কহীন মনে হতে পারে, কিন্তু যেহেতু সেগুলো একটা কেন্দীয় থিম এর কন্টেক্সট এ উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাই প্রতিটি ছবিই এই থিমকে জাস্টিফাই করবে। সাধারণত সামাজিক ইস্যুগুলি তুলে ধরার জন্য ফটোগ্রাফাররা এই অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করে থাকেন। আবির আবদুল্লাহ’র ডেথ ট্র্যাপ কিংবা জসিম সালামের ওয়াটার ওয়ার্ল্ড এই অ্যাপ্রোচের উদাহরণ।

JASHIM SALAM | Water World, Bangladesh

২. আপনার গল্পের মূল উপজীব্য যদি হয় কোন ইস্যু কিভাবে মানুষের জীবন ও পরিবেশকে প্রভাবিত করছে, তাহলে আপনি ‘ডিটেইল’ এর দিকে মনযোগ দিতে পারেন। প্রথমে গল্পটি কাগজে বিস্তারিতভাবে লিখে ফেলুন। এর পর গল্পটির নিজেই কয়েকবার পড়ুন। এখন ভাবুন কি কি বিষয়ের ছবি দিয়ে এই গল্পের মূল পয়েন্টগুলোকে শক্তিশালী করা যাবে। সেই ছবিগুলো তুলে আনুন। এই অ্যাপ্রোচে ছবিগুলোর মধ্যে একটা ধারাবর্ণনা (narrative) থাকতে হবে। আপনার গল্পটি এখানে কয়েকটি ছবির ধারাবাহিকতা। এখান থেকে আপনি যদি শুধু একটি ছবি কাউকে দেখান, তাহলে হয়তো সেই ছবিটি তেমন কোন গুরুত্ব বা আবেদন বহন করবে না, কিন্তু অন্য ছবিগুলোর সাথে থাকলে সেটা গল্প বলায় ভূমিকা রাখবে। উদাহরণ হিসেবে এম আর হাসানের Salt দেখতে পারেন।

Photo Story – Salt by Mohammad Rakibul Hasan

৩. ব্যক্তিগত অনুভূতির রোজনামচা। মডার্ন ফটোগ্রাফীতে এই বিষয়টি খুবই জনপ্রিয়। ফটোগ্রাফার এখানে নিজের ভেতরের অনুভূতি কিংবা কোন বিষয়ে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গিকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। যেহেতু বিষয়বস্তু এখানে প্রচন্ড ভাবে Subjective, কাজেই ফটোগ্রাফী এখানে অনেকসময় অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্ট ফর্মে রুপ নেয়। ফটোগ্রাফার নানা বিষয়কে তার ব্যক্তিগত অনুভূতির Proxy হিসেবে উপস্থাপন করে থাকেন। উদাহরন হিসেবে Tushiqur Rahman এর Fatalistic Tendency সিরিজটি দেখতে পারেন।

http://www.phmuseum.com/grant/tushikur/fatalistic-tendency

মূলধারার জার্নালিস্টিক ফটোগ্রাফীর সাথে এই ধরনের গল্পের বড় ধরনের পার্থক্য আছে। সোশ্যাল ইস্যুতে ফটোস্টোরিগুলোতে অ্যাপ্রোচ থাকে objective, তথা ফটোগ্রাফার সেখানে নিরপেক্ষ গল্প বলিয়ে মাত্র, কিন্তু এই ক্ষেত্রে ফটোগ্রাফার পুরোপুরি subjective, তিনি যেভাবে পৃথিবীকে দেখেন, ঠিক সেই দেখার চোখ তার ছবিতে তিনি আরোপ করেন; আপনি কি ভাবলেন না ভাবলেন তাতে তার কিছু যায় আসে না।

৪. Putting your thoughts together. ফটোস্টোরি তৈরী করতে হলে শুধু ভাল ফটোগ্রাফার হলেই চলবে না, আপনাকে লিখতেও জানতে হবে – মাতৃভাষায় এবং অন্ততঃ ইংরেজীতে ভাল দখল থাকা প্রয়োজন। যেহেতু আপনার দর্শকরা পৃথিবীর যেকোন প্রান্তেরই হতে পারে, তাদেরকে গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বিষয়বস্তু সম্পর্কে শিক্ষিত করার দায়িত্ব আপনার। গ্রামার এবং লেখার ভঙ্গি, উভয়ই ভাল হতে হবে। সেইসাথে যেই ইস্যু সম্পর্কে আপনি গল্প তৈরী করছেন, সেই বিষয়ে আপনার ভাল জ্ঞান থাকাও আবশ্যক। অনেকসময় খুব ভাল মানের ছবি থাকা সত্ত্বেও একটা ফটোস্টোরী আবেদন তৈরী করতে পারেনা দূর্বল লেখার কারণে।

৫. অনেকেই ফটোস্টোরী তৈরীতে তাড়াহুড়ো করে থাকেন। একদিন বা দুইদিন একটি ইস্যুর উপর কাজ করেই সেটাকে একটা ন্যারেটিভে ফেলানোর চেষ্টা করেন। এই কারণে বিষয়বস্তু খুব strong হওয়া সত্ত্বেও ফটোস্টোরিটি মনে হয় একেবারেই দূর্বল এবং পানসে। স্টোরি তৈরীর জন্য কয়েকটি জিনিস মনে রাখতে হবে। প্রথমতঃ আপনাকে ইস্যুটির প্রতি sympathetic হতে হবে। সোশ্যাল ইস্যু নিয়ে যেই ফটোগ্রাফার কাজ করেন তিনি একজন প্রতিবাদী চরিত্র (activist)। আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের পক্ষে কথা বলেন তিনি এবং তার ছবি। শহিদুল আলমের ‘Crossfire’ ফটোসিরিজের এক্সিবিশন সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল ইমেজ সংকটের আশংকায়।

দ্বিতীয়তঃ, গল্পের ভেতরে ঢুকতে হবে। কয়েকটি শিশুশ্রমিকের ছবি পটাপট তুলে আনলেই এই ইস্যুর উপর একটা গল্প হবে না। সমস্যার কেন্দ্রে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে..শ্রমিকদের শ্রমজীবনই শুধু নয়, তাদের ব্যক্তিগত জীবন, মতামত এবং সামাজিক অবস্থানও তুলে আনতে হবে আপনার গল্পে। আপনি যে বিষয় নিয়েই গল্প তৈরীর চেষ্টা করুন না কেন, তার কিন্তু নিদেনপক্ষে দুইটি দিক থাকে – একটি হলো ‘phenomenon’, তথা যে জিনিসটি আমরা চোখের সামনে দেখছি এবং ‘factors that gives rise to that phenomenon’ অর্থাৎ এই বিষয়ের মূলে যেই কারণগুলো – যেগুলো সাধারণতঃ মানুষের চোখে ধরা পড়ে না। আপনাকে ফটোস্টোরীতে এই দুইটি জিনিসই কাভার করতে হবে। বন ধ্বংসের উপর গল্প বলতে চান? শুধু উজাড় হয়ে যাওয়া বনের ছবি তুললেই হবে না – কি কারণে বন উজাড় হচ্ছে, কারা আছে এর পেছনে, সে বিষয় গুলোও তুলে আনতে হবে।

সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে শিক্ষক.কম এ বেসিক ফটোগ্রাফীর উপর লেকচার সিরিজ এখানেই শেষ করছি। ভাল থাকবেন!

 

লেখক পরিচিতিঃ

Capture

কার্টিসিঃ শিক্ষক ডট কম