ওড়ো অবাধে হয়ে অবাধ্য
        অর্জিত হোক যা কিছু অসাধ্য...
প্রথম লেকচারের লিংক:- ফটোগ্রাফী: ভূমিকা
দ্বিতীয় লেকচারের লিংক:-ফটোগ্রাফী: ক্যামেরা
শুরুতেই একটা কথা। টেকনিক্যাল বিষয় আমাদের কাছে সবসমই খটমটে লাগে। আমরা গাড়ি চালাই, কিন্তু গাড়ি কিভাবে চলে, সেই বিষয়ে খুব একটা ঘাটাঘাটি করতে চাইনা…ফলশ্রুতিতে রাস্তার মাঝখানে গাড়ি বসে গেলে নিজেও মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকি। ক্যামেরা গাড়ির মতো জটিল কিছু না, তারপরও টেকনিক্যাল কিছু ব্যাপার আছে। ক্যামেরা বডি সম্পর্কে যতটা পারি বলেছি আগের পর্বে, এই পর্বে বলবো ক্যামেরার ‘ডান হাত’ লেন্স নিয়ে…যতটা পারি সহজ করে। লেগে থাকুন, হয়ে যাবে!
লেন্স কারে কয়:
ক্যামেরার মাথায় যেই চোঙ্গাটা থাকে তাকে লেন্স বলে। এইটার মধ্যে দিয়ে আলো প্রবেশ করে সেন্সরে পড়ে বলেই ছবিটা ধারন করা যায়। তো এই চোঙ্গা তো নানান সাইজের, নানান রঙের হয়। কেন হয়? নিচের ছবিটা দেখেন, একই ক্যামেরার মাথায় কয়েকরকম লেন্স লাগানো সম্ভব।
ছবি ১: একই ক্যামেরা বডি, কিন্তু বিভিন্ন রকমের লেন্স
লেন্স তৈরীতে কাচের (এবং ক্ষেত্র বিশেষে অন্যান্য উপাদানের) ছোট ছোট একক (Element) ব্যবহার করা হয়, যেগুলো সারিবদ্ধ ভাবে একটা প্লাস্টিক বা মেটালের চোঙ্গার ভিতর সাজানো থাকে। এই এলিমেন্টগুলো সামনে পিছনে করেই লেন্স জুম বা ফোকাস করা হয়, যে বিষয়গুলো সম্পর্কে নিচে আলোচনা করা হয়েছে।
ছবি ২: একটি লেন্স এর মাঝ বরারবর যদি লম্বালম্বিভাবে কেটে ফেলা হয়, তাহলে এলিমেন্টগুলো এরকম দেখা যাবে। এই জিনিস দেখা ও বোঝার জন্য নিজস্ব একটি রাম-দা দিয়ে বন্ধুর একটি লেন্সকে এক কোপে এইভাবে কেটে ফেলুন।
প্রত্যেকটা লেন্স এরই কিছু সাধারণ বৈশিষ্ট আছে। প্রত্যেকটা মানুষেরই যেমন দুটো হাত, দুটো পা, একটা মাথা (কারো কারো মাথা থাকে না) ইত্যাদি থাকে, যদিও ভিন্ন রং, আকার বা জাতিভেদে; ঠিক তেমন প্রত্যেকটা লেন্স এর কিছু কমন বৈশিষ্ট আছে যেগুলোর ‘মাত্রা’ কমবেশি হতে পারে। এই বিষয়গুলো আগে আলোচনা করবো।
লেন্সএর মৌলিক বৈশিষ্ট্যসমূহ:
ফোকাল লেংথ: সহজ ভাবে বলতে গেলে, একটা লেন্স এর ফোকাল লেংথ (ভাল বাংলা পেলাম না এই শব্দজোড়া’র) এর উপর নির্ভর করে লেন্স কত দুরের বা কাছের ছবিকে ধারন করতে পারবে। সাধারণত ফোকাল লেংথ এর একক হয় মিলিমিটার (এমএম)।
সহজ সূত্র: যত বেশি ফোকাল লেংথ, তত দুরের বস্তুকে জুম করে কাছে আনা যাবে। যত কম ফোকাল লেংথ, তত বেশি ‘চওড়া’ (ওয়াইড) এলাকার ছবি একটা ছবিতে ধরা যাবে।
প্রশ্ন: একটা লেন্সএর ফোকাল লেংথ ১৮ মিমি। আর একটা লেন্স এর ফোকাল লেংথ ১৮০ মিমি। দ্বিতীয় লেন্সটি প্রথমটির তুলনায় একটি বস্তুকে কতগুন বেশি ‘কাছে টানতে’ পারবে?
১০ গুণ, তাইতো? আচ্ছা, ১০ গুণ না বলে, বলি 10X (ten times). এই এক্স এর ব্যপারটা একটু পরিচিত লাগছে না? ঠিক ধরেছেন। বাজারে বেশিরভাগ কম্প্যাক্ট ক্যামেরাতে এই X zoom জিনিসটা থাকে। যদিও ব্যপারটা খুবই আপেক্ষিক। যেমন ধরুন, যদি লেন্সটির ফোকাল লেংথ শুরু হয় ২০ মিমি থেকে, তাহলে ১০এক্স জুম বলতে বোঝাবে, ২০ মিমি থেকে ২০০ মিমি পর্যন্ত লেন্সটির ফোকাল লেংথ পরিবর্তন সম্ভব। কিন্তু যদি ফোকাল লেংথ ৩৫ মিমি থেকে শুরু হয় (বর্তমানে বেশিরভাগ কম্প্যাক্ট ক্যমেরার ফোকাল লেংথ শুরু হয় ৩০ মিমির আশেপাশে), তাহলে ১০এক্স জুম মানে ওই লেন্সকে ৩৫০ মিমি পর্যন্ত জুম করা যাবে। ৩৫০ মিমি কিন্তু একটা বিষয়কে অনেক বেশি কাছে আনতে পারে ২০০ মিমি’র তুলনায়। কাজেই কেউ যদি বলে এত এক্স, অত এক্স জুম আমার ক্যামেরায়, তাকে জিজ্ঞেস করুন শুরু কত মিলিমিটার থেকে…লেন্সএর গায়েই লেখা থাকবে।
Image 2
ছবি ৩: কম্প্যাক্ট ক্যামেরার লেন্স এর জুম ইনফরমেশন
বিভিন্ন ফোকাল লেংথ এ তোলা কয়েকটি ছবির উদাহরণ:
ছবি ৪: ১০ মিমি ফোকাল লেংথ এ তোলা ছবি। অনেকখানি চওড়া এলাকা ধারন করা হয়েছে।
The Earth is God's Canvas. [..Narayanganj, Bangladesh..]
ছবি ৫: ৫০ মিমি। কিছুটা বেশি জুম করা…সাবজেক্টকে আশে পাশ এর বিষয় থেকে আলাদা করা হয়েছে। ৫০ মিমি ফোকাল লেংথ এর একটা ব্যপার আছে। বলা হয়ে থাকে যে, এই ফোকাল লেংথ মানুষের চোখ এর দৃষ্টিসীমার মূল অংশ কে ধারন করে। আমরা যখন একটা দৃশ্য দেখি, তখন কিন্তু অনেকখানি এলাকাই দেখি…কিন্তু আমাদের মনোযোগ থাকে চোখের ঠিক সামনের অংশে (Area of attention)। চোখের কোনেও কিন্তু অনেককিছু ঘটে, যেটা আমরা খুব একটা খেয়াল করে দেখিনা। ৫০ মিমি লেন্স আমাদের চোখের এই “এরিয়া অফ অ্যাটেনশন” কে ছবিতে তুলে আনে। 
ছবি ৬: ২০০ মিমি তে তোলা ছবি..অনেকখানি জুম করে তোলা।
অ্যাপারচার (Aperture): ক্যামেরায় কতখানি আলো প্রবেশ করবে সেটা নির্ভর করে Aperture এর উপর। লেন্সএর ভেতরে এই আলো নিয়ন্ত্রনের মেকানিজম থাকে। টেকন্যিকালি অ্যাপারচারকে প্রকাশ করা হয় F-value দিয়ে। উদাহরনস্বরুপ, f/1.4 এ ক্যামেরায় যতখানি আলো প্রবেশ করবে, f/2 এ ঠিক তার অর্ধেক আলো প্রবেশ করবে। একই ভাবে f/2.8 এ f/2 এর তূলনায় অর্ধেক আলো প্রবেশ করবে। কাজেই বিষয়টি নিচের মত করে লেখা যায়….যদি মনে রাখতে পারেন, তাহলে কাজে দেবে:
f/1.4 > f/2 > f/2.8 > f/4 > f/5.6 > f/8…
এই সিরিজের প্রত্যেকটি মান আগের মানের তুলনায় অর্ধেক আলো প্রবেশ করতে দেবে লেন্স এর ভিতর দিয়ে। সাধারণতঃ ছবি তোলার সময় এক্সপোজার নিয়ন্ত্রনের জন্যেই আমরা F value কম বেশি করে থাকি; যদিও অনেকসময় Depth of field নিয়ন্ত্রনের জন্যেও F কমানো বাড়ানো হয়। নিচে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
ফোকাসিং:
“দোস্ত, আমার ছবিটার পিছনে ঘোলা কইরা দে। তোর ক্যামেরায় ছবি তুললে কি সুন্দর পিছনের সবকিছু ঘোলা হয়ে যায়, আর চেহারাটা শার্প আসে”।
এই কথা আমরা অনেক শুনি, এবং বলি। ক্যামেরায় কারো চেহারার ছবি তুললে অনেক সময়ই দেখা যায় চেহারাটা একদম পরিস্কার, আর পেছনের সবকিছু ‘ব্লার’ হয়ে গেছে। এটা কেন হয়?
যেকোন দৃশ্যের ছবি তুলতে গেলে ক্যামেরায় আলো ঢোকাতে হবে। একটা নিদৃষ্ট বিন্দুতে যদি লেন্সকে ফোকাস করা হয়, তবেই ওই বিন্দু (অথবা সাবজেক্ট বলতে পারেন) এর ছবি ধারালো ভাবে আসবে। আসুন ছোট বেলার একটা খেলার কথা মনে করি। আমরা অনেকেই ‘আতশ কাচ’ দিয়ে সূর্যের আলোকে কেন্দ্রীভূত করে কাগজ বা ছোটখাটো জিনিসে আগুন ধরানোর চেষ্টা করতাম। আমার এক বন্ধু সাথে একটা আতশ কাচ রাখতো সিগারেট ধরানোর জন্যে, আর আমি নিষ্ঠুর মজা পেতাম মাঝে মাঝে পিপড়া’র গায়ের উপর এই এক্সপেরিমেন্ট করে। তো, এই খেলার মূল বিষয় কিন্তু ছিল সূর্যের ‘ছবি’ কে একটা বিন্দুতে প্রতিফলিত করা। যত সূক্ষ্ণ ভাবে এই প্রতিফলন তৈরী করা যায়, ততই বেশি তাপ তৈরী হয়। নিচের ছবি দেখুন…মনে পড়ে কিছু?
ছবি ৭: আতশ কাচ দিয়ে সূর্যরশ্মি কে কেন্দ্রীভূত করা হচ্ছে।
এই বিষয়ে কথা বলার একটাই উদ্দেশ্য, ফোকাসিং সম্পর্কে একটা সহজ ধারনা দেয়া। আপনি বা আমি যেমন একটা সাধারন লেন্স দিয়ে সূর্যের ছবি ফোকাস করার চেষ্টা করতাম, ক্যামেরাতেও সেই একই কাজ করতে হবে…যেকোন বিষয়কেই সঠিক ভাবে ফোকাসে আনতে না পারলে স্পষ্ট ছবি পাবেন না।
মুশকিল হলো, ক্যামেরার লেন্স একই সময়ে শুধুমাত্র একটা ‘তল’ এই শার্প ফোকাস করতে পারে। নিচের ছবিটি দেখুন। মনে করুন আপনি দাড়িয়ে আছেন এবং আপনার ঠিক পিছনেই একটা গাছ। যখন আপনার উপর ক্যামেরা ফোকাস করবে, তখন অন্য সব তলে যা কিছুই থাকুক না কেন, সেগুলো অত শার্প হয়ে ধরা পড়বে না, যতটা ধরা পড়বে আপনার চেহারা। খেয়াল করে দেখুন, আলোক রশ্মিগুলো তল দুই এর উপর মিলিত হয়েছে একটা বিন্দুতে, কিন্তু সামনে বা পিছনের তলগুলোতে এক বিন্দুতে মিলিত হয়নি। কোন কিছুর ছবি শার্প ভাবে ধরা পড়বে কি না, তা নির্ভর করে আলোর এই একই বিন্দুতে মিলিত হওয়ার উপর। ছবি তোলার সময় ক্যামেরা শুধু একটা তলেই এই আলোর রশ্মি একটি বিন্দুতে মিলিত হয়, অন্য কোন তলেই আর এরকম শার্পভাবে মিলিত হয়না।
ছবি ৮: দুই নম্বর তল এ আলোক রশ্মি একটা বিন্দুতে মিলিত হয়েছে, কাজেই এই তলের বিষয় বস্তু গুলো ছবিকে স্পষ্ট ভাবে ধরা পড়বে। তল তিন এর ছবিও ধরা পড়বে, তবে অতটা স্পষ্ট ভাবে নয়। সবচেয়ে অস্পষ্ট (Blur) মনে হবে তল এক এ থাকা জিনিসগুলো। অর্থাৎ বলা যায়, ক্যামেরা দুই নম্বর তল এ ফোকাস করা হয়েছে।
কাজেই ক্যামেরা যেই বস্তু বা বিন্দুর উপর ফোকাস করে, সেটি পরিস্কার ভাবে ছবিতে আসে, আর যেটার উপর ফোকাস করতে পারেনা, সেটা ‘আউট অব ফোকাস’ বা ঘোলা হয়ে যায়। এই ঘোলা হওয়ার ব্যপারটি এসএলআর ক্যামেরায় খুব তীব্র ভাবে ধরা পড়ে, কিন্তু কম্প্যাক্ট ক্যামেরার লেন্স আর সেন্সর ছোট বিধায়, সেখানে হিসাব একটু ভিন্ন….এত বেশি ঘোলা ভাব সেখানে ধরা পড়েনা। বিস্তারিত ব্যখ্যায় গেলাম না, তবে নিচের লিংকে এই বিষয়ে কিছুটা আলোচনা আছে, আগ্রহীরা পড়ে নিতে পারেন:
ডেপথ অব ফিল্ড (Depth of field): এই বিষয়টি মূলত আগের ‘ব্লার’ বা আউট অব ফোকাস এর আলোচনার সাথে সম্পর্কিত। একটি ছবির মূল বিষয় (অর্থাৎ যেই সাবজেক্টের উপর ফোকাস করা হয়েছে) ছাড়াও অন্য বিষয়গুলো কতখানি স্পষ্ট বা Sharply আসছে, সেটা ব্যখ্যা করা হয় Depth of Field দিয়ে। যেমন ধরুন, নিচের ছবি দু’টো। প্রথম ছবির Depth of field অনেক বেশী, কেননা এখানে ফোকাসড বিষয় ছাড়াও, সামনে এবং পেছনের বিষয়গুলোও অনেক সুস্পষ্ট। কিন্তু পরের ছবিতে ডেপথ অব ফিলড খুব কম বা Shallow, কেননা এখানে যে বিষয়ের উপর ফোকাস করা হয়েছে, সেটা ছাড়া আর কোন কিছুই খুবএকটা স্পষ্ট ভাবে বোঝা যাচ্ছেনা। ছবির যে অংশ এরকম ঘোলা হয়ে যায়, তাকে বলে ‘বোকেহ (Bokeh)’।
In the land of landscapes - III [..Singair, Bangladesh..]
ছবি ৯: এই ছবির ডেপথ অব ফিল্ড অনেক বেশি
ছবি ১০: এই ছবির ডেপথ অব ফিল্ড অনেক কম। শুধু ফোকাসড বিষয় বাদে বাকি সব ঘোলা হয়ে গেছে।
ডেপথ অব ফিলড নির্ভর করে মূলতঃ দু’টো বিষয়ের উপর। এক: কত ফোকাল লেংথ এ ছবি তোলা হচ্ছে। যত কম ফোকাল লেংথ (অর্থাৎ ওয়াইড এ্যাঙ্গেল এ) এ ছবি তোলা হবে, এই ডেপথ তত বেশি হবে। যত জুম করে ছবি তোলা হবে, তত সামনে পিছনের বিষয় ঘোলা হয়ে যাবে…Depth of field  ও কমে যাবে। দুই: লেন্স এর অ্যাপারচার যত বড় করে ছবি তোলা হবে (অর্থাৎ F value কমিয়ে), তত ডেপথ অব ফিল্ড কমবে, ব্যাকগ্রাউন্ড ঘোলা হয়ে যাবে। একই ছবি F 2.8 দিয়ে তোলা হলে যতখানি ডেপথ অব ফিল্ড আসবে, F 8 দিয়ে তোলা হলে তার চেয়ে অনেক বেশি Depth of field পাওয়া যাবে এবং ওভারঅল ছবি অনেক শার্প মনে হবে।
লেন্স মাউন্ট (Lens mount): মাউন্ট হল ক্যামেরার সেই অংশ, যেখানে লেন্সকে জোড়া লাগানো হয় ক্যামেরার সাথে। সাধারণতঃ একটা কোম্পানীর লেন্সকে আপনি আর একটা ক্যামেরার সাথে লাগাতে পারবেন না, যেমন নাইকন এর লেন্স ক্যানন ক্যামেরায় ব্যবহার করা যাবে না (যদি না কোন বিশেষ অ্যাডাপ্টার ব্যবহার করা হয়)। এর কারণ হল, প্রত্যেকটা কোম্পানিই তাদের ক্যামেরাগুলোকে এমন ভাবে তৈরী করে যেন অন্য কোম্পানীর তৈরী লেন্স সেখানে খাপ না খায়। ক্যাননের লেন্স মাউন্টকে বলা হয় EF mount. মোটামুটি পুরানো সব ক্যানন লেন্সই আপনি আধুনিক ডিএসএলআর এ ব্যবহার করতে পারবেন, কেননা এরা সবাই একই মাউন্ট সাপোর্ট করে। যদিও ক্যাননের EF-S মাউন্টের লেন্সগুলো ফুলফ্রেম ক্যামেরায় ব্যবহার করা যায় না, অর্থাৎ এরা ব্যাকওয়ার্ড কম্প্যাটিবল না।
ছবি ১১: ক্যাননের EF mount
nikon F mount
ছবি ১২: নাইকনের F-mount
অ্যাঙ্গেল অব ভিউ (Angle of view): এই অংশ ভাল করে পড়ুন..খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা তো জুম লেন্স জুম লেন্স বলে অনেক চিৎকার চেচামেচি করি…টাকা জমিয়ে একটা ভাল জুম কেনার চেষ্টা করি। কারন কি? পাখির ছবি তুলবো। তো আপনার জুম লেন্স কি পাখি ধরার ফাঁদ, যে পাখিকে টেনে কাছে নিয়ে এসে ক্যামেরায় বন্দি করবেন? যেই লেন্স ই ব্যবহার করুন না কেন পাখি কিন্তু পাখির যায়গাতেই থাকবে যদিও  ছবি দেখে মনে হবে পাখি আপনার কোলে এসে বসে আছে।
এই ব্যপারটি কেন ঘটে? দুরবীন বা জুম লেন্সএর জন্যে একই কথা খাটে…কিভাবে দুরের জিনিস অনেক খানি কাছে মনে হয় এই ধরনের লেন্স ব্যবহার করলে? নিচের ছবিটি দেখুন:
angle of view concept
ছবি ১৩: অ্যাঙ্গেল অব ভিউ এর ধারনা। ছোট ফোকাল লেংথ এর লেন্স এর অ্যাঙ্গেল অব ভিউ বড়, কাজেই কোন দৃশ্যের বড় একটা অংশ কে পর্দায় ধরতে পারে। ফোকাল লেংথ বড় হলে এই অ্যাঙ্গেল কমে যায় এবং দৃশ্যের ধারনকৃত অংশের আকার ছোট হয়ে যায়।
প্রত্যেকটা লেন্সের ভিতর আলো প্রবেশ করে একটা নিদৃষ্ট কোণ এ। এই কোণ যত বড় হবে, তত ‘বড় দৃশ্যে’র ছবি ধরা পড়বে সেন্সরে। আর এই কোণ যত ছোট হবে, তত ছোট একটা এলাকার ছবি পুরো সেন্সর জুড়ে ধরা পড়বে। এখন যদি একটা ছোট দৃশ্যের ছবি আপনার ক্যামেরার পুরো সেন্সর জুড়ে ধরা পড়ে, স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে যে দৃশ্যটা অনেক কাছে চলে এসেছে।সুতরাং, লেন্স যত জুম করা যাবে, ততই Angle of view কম হবে।
ইমেজ স্ট্যাবিলিটি/ভাইব্রেশান রিডাকশন (Image stability/Vibration reduction): বর্তমানে বেশিরভাগ লেন্স এই এই IS অথবা VR অপশন থাকে। দুটো আসলে একই জিনিস, শুধু ভিন্ন ভিন্ন কোম্পানীর ট্রেডমার্ক। IS হলো ক্যানন আর VR নাইকনের ট্রেডমার্ক। সাধারন ভাবে বলতে গেলে, অল্প আলোতে ছবি তুলতে গেলে অনেক সময় এক্সপোজার টাইম বেশি রাখতে হয়। তো অনেকক্ষন ধরে ক্যামেরার লেন্স ওপেন করে রাখলে বেশি আলো প্রবেশ করে ঠিকই, কিন্তু ওই দীর্ঘ সময়ে আপনার হাত যদি কেঁপে যায়, সেই কাঁপাকাঁপিও ছবিতে চলে আসে। অল্প আলোতে ছবি তোলার সময় যেন ছবি কেঁপে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতেই এই টেকনোলজি ব্যবহার করা হয় লেন্সগুলোতে। এক্সপোজার অধ্যায়ে এই বিষয়ে আরো আলোচনা করা হবে।
লেন্সের প্রকারভেদ:
এতক্ষনে নিশ্চয়ই ওয়াইড এঙ্গেল এবং জুম লেন্স সম্পর্কে একটা ধারনা হয়ে গেছে। আর একটু বিশদ আলোচনা লেন্স কতপ্রকার সে সম্পর্কে:
১. ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স: এই লেন্সগুলোর ফোকাল লেংথ অনেক কম হয়ে থাকে..১০ মিমি থেকে ২৪ মিমিএর মধ্যে। নামের মতোই, এদের অ্যাঙ্গেল অব ভিউ অনেক ‘wide’ অর্থাৎ বড়; কাজেই অনেক বড় দৃশ্যের ছবি ধারন করতে পারে।
২. নরমাল লেন্স: ২৪ থেকে ৫০ মিমি ফোকাল লেংথ এর মধ্যের লেন্সুগলোকে নরমাল লেন্স বলে।
৩. টেলিফটো লেন্স: ডিফাইন করা মুশকিল। তবে ধরে নিতে পারেন যে সব লেন্স অনেক দুরের ছবি তুলতে পারে তারাই টেলিফটো লেন্স। এগুলো Narrow angle লেন্স, অর্থাৎ অ্যাঙ্গেল অব ভিউ অনেক কম..কাজেই দুরের জিনিস কাছে এনে ছবি তোলা যায়। ৫০ মিমি’র উপরে হলে সেটাকে টেলিফটো লেন্স বলা যেতে পারে…সাধারনতঃ ৫০ মিমি থেকে ৫০০ মিমি’র মধ্যে বাজারে বিক্রি হয়। এর চেয়ে বেশি জুম কিনতে গেলে অর্ডার দিয়ে বানানো লাগতে পারে! (জাস্ট কিডিং)।
canon-supertele-reflex
ছবি ১৪: ৫২০০ (জ্বি, পাঁচহাজার দুইশ মিলিমিটার) মিমি ক্যানন জুম লেন্স।
জুম লেন্স আকারে বড় হয় কেন, আর ওয়াইড অ্যাঙ্গেল লেন্স আকারে ছোট হয় কেন? লেন্স এর দৈর্ঘ তার ফোকাল লেংথ এর সাথে সম্পর্কিত। যত বেশি ফোকাল লেংথ হয়, লেন্স তত বড় করতে হয়..অন্যান্য ফ্যাক্টরও থাকতে পারে, এই মুহুর্তে মনে পড়ছে না।
৩. ম্যাক্রো লেন্স: এই ধরনের লেন্স এর কাজ কোন একটি বিষয়কে খুব কাছে থেকে তোলা। সাধারনতঃ বিষয়বস্তু থেকে একটু দুরে লেন্সকে রাখতে হয়, তা না হলে ফোকাস করা সম্ভব হয়না। ম্যাক্রো লেন্স গুলোকে আপনি বিষয় বস্তুর একদম কাছে নিয়ে যেতে পারবেন..কাজেই একটা ভিন্ন পার্সপেক্টিভ থেকে ছোট জিনিসের ছবি তুলতে পারবেন।
shooting macro
ছবি ১৫: ম্যাক্রো লেনস্ দিয়ে ছবি তোলার ছবি।
ছবি ১৬: ম্যাক্রো ছবি। ফটোগ্রাফার: অভিজিৎ নন্দী
৪. ফিক্সড ফোকাল লেংথ বা প্রাইম (Prime) লেন্স: এইধরনের লেন্স এর ফোকাল লেংথ একটাই। যেমন ধরুন ৩৫ মিমি ফিক্সড লেনস। আপনি চাইলেও এই লেন্স এর ফোকাল লেংথ বাড়াতে বা কমাতে পারবেন না।
৫. ভ্যারিয়েবল বা পরিবর্তনশীল ফোকাল লেংথ এর লেন্স: আমরা বেশিরভাগ সময়ই এই ধরনের লেন্স ব্যবহার করি। যেমন ধরুন ২৮ – ১৩৫ মিমি লেন্স। এই লেন্সটির ফোকাল লেংথ ২৮ মিমি (ওয়াইড অ্যাঙ্গেল) থেকে ১৩৫ মিমি (মোটামুটি জুম) পর্যন্ত কম বেশি করা যাবে। এই ধরনের লেন্স এর জনপ্রিয়তার কারণ সিম্পল: একের মধ্যে বহু অপশন। আপনি একই লেন্স এর জুম কম বেশি করে বিভিন্ন দুরত্বের বস্তুর ছবি তুলতে পারছেন, যেটা প্রাইম লেন্স এ সম্ভব নয়। তাহলে প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা কেন প্রাইম লেন্স ব্যবহার করি? উত্তর সহজ..প্রাইম লেন্স এর ছবির কোয়ালিটি অনেক বেশি উন্নত হয়ে থাকে সাধারন জুম লেন্স এর তূলনায়। যেহেতু পরিবর্তনশীল ফোকাল লেংথ এর লেন্সগুলোর ভিতরের এলিমেন্টগুলো মুভেবল এবং এইধরনের লেন্স অনেকগুলো ফোকাল লেংথ এ কাজ করে, ছবির মান ঠিক রেখে কম খরচে ভাল জুম লেন্স তৈরী খুবই কঠিন। Canon 200 mm (prime) f/2.8 লেন্স এর দাম মোটামুটি ৮৫০ ডলারের মতো, সেখানে Canon 70-200 mm (zoom) f/2.8 লেন্স এর দাম প্রায় ১,৬০০ ডলার।
৬. ফিশ আই (Fish eye) লেন্স: এই লেন্সগুলোর Angle of view অনেক বেশি, প্রায় ১৮০ ডিগ্রীর কাছাকাছি। কাজেই ক্যামেরা তাক করলে পুরো ডান থেকে বামের সব কিছুই ছবিতে চলে আসে। নিচের ছবিটা দেখুন:

ছবি ১৭: ফিশআই লেন্স এ তোলা ছবি।ছবির পরিচয় আর কি দেবো? ফটোগ্রাফার: অভিজিৎ নন্দী
আজকে এ পর্যন্ত।সবাই ভাল থাকবেন, আর প্রশ্ন/মন্তব্য থাকলে কমেন্ট এ জানাতে ভুলবেন না!

লেখক পরিচিতিঃ

 
কার্টিসিঃ শিক্ষক ডট কম