ওড়ো অবাধে হয়ে অবাধ্য
        অর্জিত হোক যা কিছু অসাধ্য...
২৩০০ ছাত্রছাত্রী বাতিল করার ডিসিশন নেয়া হয়েছে।

চমৎকার এক রসিকতায় মেতেছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আবার অনেকের মতে খুব ভালো ডিসিশন নেয়া হয়েছে এতে নাকি ক্যান্টিন কিংবা লিফটে চাপ কম পড়বে। রস এবার দুপক্ষই করলো মাঝখানে “হায় আল্লাহ কোন পথ নাই?” বলে দৌড়ে বেড়াচ্ছে হাজার টা ভাই বোনেরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শত চাকচিক্যের আড়ালেও ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব সত্য তুলে আনার চেষ্টা করবো আজকে।দীর্ঘ ৩- ৪ বছর পড়ার পর এখন ২৩০০ ছাত্রছাত্রীর ভর্তি বাতিল করার ডিসিশন নিয়েছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কারন এই ২৩০০+ ছাত্রছাত্রীর একাডেমিক রেজাল্ট খারাপ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষায় তারা এখন প্রবেশনে।

যারা প্রবেশনারস দের ডিসমিস করার ব্যাপারে হ্যা সূচক কথা বলেছেন, শিক্ষক শিক্ষিকা ছাত্রছাত্রী এবং অবশ্যই সেসব কর্তৃপক্ষ যারা ডিসিশন গুলা নিচ্ছেন আপনাদের কাছে কিছু প্রশ্ন ছিলো,

১. যেহেতু ইমব্যালেন্স পপুলেশন আপনারাই তৈরী করেছেন, আপনারা বাড়তি ছাত্রছাত্রী কেন ভর্তি করিয়েছেন?
ক)- জাতীয় স্বার্থ (দেশকে অধিক শিক্ষিত করা)
খ)- লিফটে চাপ বাড়িয়ে ছেলেমেয়েদের সিঁড়ির ব্যবহার শিখানো
গ)- ক্যান্টিনে অধিক বিক্রি।
ঘ)- নিজেদের পকেট ভারী করা।

উত্তর টা আমরা সবাই জানি।

২. আপনারা প্রবেশনারস দের জন্য কি কি উদ্যেগ নিয়েছেন?
উত্তর হচ্ছে: এক সেমিস্টার পর পর ওদের আইডি ডিসমিস করে দেয়া, রেজিস্টার থেকে আইটি, আইটি থেকে ব্যাংক, ব্যাংক থেকে আইটি, ডিপার্টমেন্ট স্যারের কাছে দৌড়াদৌড়ি, বাবা-মাকে ডাকো, এদের অপমান করো।
এবং যারা বলছে ৩ বার কেমনে প্রবেশনে পড়ে?
শুনুন, নর্থ সাউথ এই পলিটিক্সটা বুঝে করেছে নাকি ভুলে করেছে জানিনা, কিন্তু কারো আইডি যখন একবার ডিসমিস হয় (১ম প্রবেশন) সে রেগুলার এডভাইসিং করতে পারেনা।
আপনারা সবাই যখন ভালো ভালো সিটের জন্য পোস্ট দেন সে তখন ডিপার্টমেন্ট থেকে ডিপার্টমেন্টে দৌড়ায় শুধু একটা সাইনের জন্য। কিন্তু কেউ সাইন দেয়না। ঘুরাতে থাকে।
নোটিশ আসে।
একটা ব্যবস্থা হয়।
সবার শেষে তারা এডভাইসিং করে। এবং আপনারা সব ভালো সিট নিয়ে ফেলার পর যেগুলা আর কেউ নেন না ওরা ওগুলো পায়। (যদিও এক এক সেমিস্টারে নতুন নতুন রুলসের কারনে সাফারিংস গুলোও ভিন্ন ছিলো!)

নামমাত্র এডভাইসিং বা এডভাইসর আদৌ কি করে জানা আছে তো?

৩. বাবা মা কে হেনস্থা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের কতটা যুক্তিযুক্ত? আদৌ কি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধিকার আছে?

উত্তর টা জটিল। একদিক থেকে স্টুডেন্ট এর বাবা মা ভার্সিটির খায়ও না পড়েও না যে বৃদ্ধ বয়সে এই হ্যাসেল টা নিবে। আবার ছেলেমেয়ের গার্জিয়ান যেহেতু হয়েছো, নর্থ সাউথে যেহেতু এসেছো, হ্যাসেল তো নিতেই হবে।

যে বয়সে একটা ছেলে বা মেয়ে একা ব্যাচেলর থাকে, নিজের মাস চালায়, দেশের সংসদ নির্বাচন করে, ব্যবসা বানিজ্য করে,
একা একা বিদেশ যায়,
যে বয়সে একটা মেয়ে একা একা ঘর সামলায়, নিজেই মা হবার দায়িত্ব নেয়ার ম্যাচিউরিটি আসে সে বয়সে তাদের সামান্য রেজাল্ট খারাপ থাকায় আপনি তাদের বাবা মা দের হেনস্থা করতে পারেন না! আপনারা যদি মনে করেন বাবা মা বকা দিলে ঠিক হয়ে যাবে এত বড় বড় দাড়ি মোচ ওয়ালা ছেলেমেয়েরা; তবে বলি, এরকম বাকওয়াস বুদ্ধি ক্যান্টিনে যারা টেবিল মুছে বা বাথরুম পরিষ্কার করে ওরাও বোধহয় দিবেনা।
অনেকের ফ্যাকাল্টি এডভাইজার ভালো পড়ে, ভালো কথা বলে। তারপরও যখন কারো বাবা-মা সিলেট, রাজশাহী বা চট্টগ্রাম থেকে দৌড়িয়ে দৌড়িয়ে এক দিনের নোটিশে আপনাদের এক মিনিটের ঝাড়ি খেতে আসে, আপনাদের কিছু যায় আসেনা। কারন আপনারা ঝাড়ি টা দেন এসি রুমে বসে! এবং বাবা মা কে বোঝানো যায়না সব ঠিক হয়ে যাবে, কারন উনারা আমাদের এযুগের সেমিষ্টার/ক্রেডিট বুঝেননা। তারা শুধু টেনশনে পড়তে জানেন। মনে করেন তার ছেলে/ মেয়েরা নষ্ট হয়ে গেসে।

আমার এক বান্ধবী বলেছিলো, দোস্ত আমার মা লিফটে কেঁদে দিয়েছে আমি এটা সহ্য করতে পারিনাই। সে একবারও বলেনি নেক্সটে ভালো করে পড়ালেখা করবে। বলেছে, “শালার নর্থ সাউথ যদি ভাঙ্গি দি পারতাম! বোম মারি উড়ায় দি পারতাম!”
(মনে মনে বললাম ভাগ্যিস কোন রিপোর্টার নেই এখানে! নয়তো কনফার্ম “কেন তারা জঙ্গি হয়” বলে একটা শিরোনাম হয়ে যেত!)

 

সমাধান:
যদিও নর্থ সাউথ আমাদের কথা ভাবেন না।
আসুন আমরা কয়েকটা কাল্পনিক সমাধান ভাবি যেগুলোর খুব সহজ বাস্তবায়ন সম্ভব। প্রয়োগ করা খুব সহজ এবং কোটি টাকার আইটি ডিপার্টমেন্টও কেনা লাগবেনা! (আফটার অল আমাদেরই টাকা)

 

১. সিস্টেম করেসেন যার যত বেশী ক্রেডিট কমপ্লিট, তার তত আগে এডভাইসিং। (এটা একটা ফাঁদ)
ভালো স্টুডেন্ট এমনিতেই ভালো অথচ তারা আগে এডভাইসিং করে সমবয়সী দের চেয়ে। আর যেসব প্রবেশনারস রা বিপদে আছে, ভার্সিটি ওদের আরও বিপদে ফেলে দেয় আইডি ডিসমিস করে। অথচ স্পেশাল চাইল্ড দের সামনে বসতে দেয় পুরো পৃথিবী।
একবার দুবার তাদের ভালো করার সুযোগ দিন, ভালো টিচার পেতে সাহায্য করুন! (ভালো টিচার = যাদের পড়ানো তারা ভালো বুঝতে পারে)
অর্থাৎ প্রবেশনারস রা আগে এডভাইসিং করুক কারন তাদের বাচা-মরার মত অবস্থা। (অনেকেই নিজের স্বার্থ দেখবেন, কিন্তু আমি জানি যারা প্রবেশনে পড়েছে ওদের কে কাছ থেকে চিনলে আপনারাও রাজী হবেন কারন জানবেন তাদের প্রেশার টা কি!)

২. তাদের জন্য আলাদা সেকশন করুন অথবা আলাদা সিট রাখুন।

৩. ওদের যত্ন নিন। একদিনের জন্য এডভাইসর না বানিয়ে তারা যেসব কোর্স নিচ্ছে ঐ কোর্সের টিচারদের জানিয়ে দিন আপনার কোর্সে দুজন স্পেশাল চাইল্ড আছে। অফিস রুমে ভালো স্টুডেন্ট গুলা তেল দিতে আসে। ঐ তেল না খেয়ে বিপদে পড়া ছেলেমেয়েগুলা ক্লাস শেষে ১০ মিনিটের জন্য ডাকুন। ওর সমস্যা টা সমাধান করে দিন।
বাবা-মা ডাকলে সমাধান হয়না।

৪. একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৩০০+ (৪ এর অধিক প্রবেশন!) ৬০০০+ (১/২/৩ প্রবেশন!) ভাবা যায়?
(সঠিক সংখ্যাটা নিয়ে সন্দিহান, কিন্তু এগুলোর খুব কাছাকাছিই হবে। কেউ জানালে জানাবেন)

অসংখ্য ফ্যাকাল্টি মেম্বারও এই বাবা-মা অথবা তাদের হেনস্থার ব্যাপারে বিরক্ত। (নিজের কানে শোনা) শুধুমাত্র কর্তৃপক্ষের আদেশ বলে কথা! এবং একজন ফ্যাকাল্টি মেম্বারের এও কমপ্লেন (নাম বলছিনা) “তারা তো (অথরিটি) নিচে নেমে দেখেনা এই মাছের বাজারে কার কি কষ্ট!”
জ্বি হ্যা! এক ফ্যাকাল্টি মেম্বারের মুখের কথা।

পরিশেষে একটাই কথা, যতক্ষণ ভার্সিটিতে আছে এই স্টুডেন্ট গুলার বাবা মা আপনারা। আপনাদের প্রোপার গাইডলাইন আর মোটিভেশন এই ছেলেমেয়েগুলো আজীবন মনে রাখবে। আপনাদের একটা কথা হয়ে যেতে পারে তাদের লাইফ চেইঞ্জিং মোটো। একটা আশীর্বাদ হতে পারে সারাজীবন এর ভুল গুলো কে শুধরানোর অদ্ভুত আমন্ত্রণ। এরা যেদিন রত্ন হয়ে ফিরবে, আপনাদের চেয়ে গর্বিত আর নিশ্চয়ই কেউ হবেনা।

তাই তাদের ভার্সিটির সময়গুলো তাদের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময় হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করুন। যাতে ভার্সিটি জীবনটা শেষ হয়ে গেলেও ভার্সিটির প্রতি তাদের ভালবাসাটা অটুট থেকে যায় আজীবন।

ধন্যবাদ।

(প্রয়োজনে আপনার পরিচিত ফ্যাকাল্টি মেম্বারদেরকেও ট্যাগ করতে পারেন যারা এই সমস্যার পাশে দাড়াতে চায় অথবা বুঝতে চায়।)
সমাধান এবং আইডিয়া গুলো শেয়ার করুন। কারন অথরিটির মাথা আর কিছু করার নাই নামক রোগে আক্রান্ত।
অবশ্যই কিছু করার আছে। আমরা এক হলে অবশ্যই সবকিছুর সমাধান সম্ভব।

 

[লেখকঃ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র]