ওড়ো অবাধে হয়ে অবাধ্য
        অর্জিত হোক যা কিছু অসাধ্য...
ডিপ্রেশন বর্তমান সময়ের অন্যতম কমন একটা মনস্তাত্বিক সমস্যা। পৃথিবীর প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন মানুষ ডিপ্রেশনে ভোগে। ডিপ্রেশনের রকমফের আছে। এখন পর্যন্ত ৯ ধরণের ডিপ্রেশন শণাক্ত করা হয়েছে।
 
আচ্ছা,প্রথমেই জানি ডিপ্রেশন কি। সহজভাবে বললে এটা এমন একটা অবস্হা, যখন আপনার কোন কিছু ভালো লাগবে না, কোন কাজে আগ্রহ পাবেন না, দুঃখের স্মৃতিগুলো মনে পড়বে, প্রচন্ড ক্লান্ত লাগবে, নিজেকে অসহায় মনে হবে, একাকীত্ব ভালো লাগবে, নিজেকে অপরাধী মনে হবে, ঘুমাতে না পারা, অন্যের সাথে অকারণে খারাপ ব্যবহার করে বসবেন, আপনার যা আগে ভালো লাগত এখন তা ভাল লাগছে না। এছাড়াও আরো অনেক লক্ষণ থাকতে পারে।
 
ডিপ্রেশনের একটা বায়োলজিক্যাল ব্যাখা দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন বিজ্ঞানীরা। আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনগুলো একটা হয়মোন ক্ষরণ করে যার নাম সেরোটোনিন। এই হরমোন আমাদের ভালো লাগা তৈরি করে। কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কে সেরিটোনিন, ডোপামিন এই ধরণের আনন্দদায়ী হরমোনগুলোর উৎপাদন হ্রাস হলে আমরা ডিপ্রেশনে ভুগি। ডিপ্রেসনে ভোগা মানুষের মস্তিষ্কের এ্যামিগডালা অংশটি অধিক সক্রিয় হয়। হিপোক্যাম্পাস পার্টটি সংকীর্ণ হয়ে যায়। নিউরন কোষগুলো ছোট হয়ে যায় এবং সিনাপ্স/সাইনাপ্স কানেকশন দূর্বল হয়ে পড়ে।
 
ডিপ্রেশন আমাদের বাঁচার আগ্রহ কমিয়ে দেয়। এমনকি আত্মহত্যার কারণ হতে পারে। তাই ডিপ্রেশন ফ্রি লাইফ লিড করার কিছু টিপস শেয়ার করছি-
 
১. প্রথমেই চিহ্নিত করুন আপনি কেন ডিপ্রেসড। আমি কিছু মৌলিক কারণ তুলে ধরে ব্যাখ্যা করছি-
 
প্রথমত, নিজের ব্যর্থতা নিয়ে ডিপ্রেশনে ভোগা। হতে পারে প্রেমে, পরীক্ষার খাতায়, শেয়ার মার্কেটে, প্রতিযোগিতায়, ক্ষমতার লড়াইয়ে, জব মার্কেটে বা অন্য যেকোন খানে আপনি ব্যর্থ। কিন্তু আরো অনেক ক্ষেত্র এখনো রয়ে গেছে যেখানে আপনার পা পড়ে নি। আপনি তাহলে এক কাজ করুন। ভেবে দেখুন যে কাজে ব্যর্থ হয়েছেন সেটা Continue করবেন কিনা। যদি করেন তাহলে অতীতের ম্যাথড চেন্জ করে ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে শুরু করুন। কেন সাফল্য আসবে না? আর যদি মনে হয় যে ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছেন সে ক্ষেত্রটি আপনার জন্য না তাহলে নতুন কাজে মনোযোগ দিন। সাফল্যের পূর্বশর্ত হচ্ছে আপনি কি পারেন সেটা জানা।
 
দ্বিতীয়ত, কম্পেরিজন বা তুলনা থেকে ডিপ্রেশন আসতে পারে। সাপজ আপনি একটা এমন সাবজেক্ট নিয়ে পড়াশোনা করছেন যেটার মার্কেট ভ্যালু আমাদের দেশে একটু কম, কিন্তু আপনার চেয়ে স্কুল লাইফে পিছিয়ে থাকা বন্ধুটি পড়ছে একটা টপ ভার্সিটির টপ সাবজেক্টে। পড়তেই পারে। কারণ শুধু মেধা দিয়েই সব নির্ধারণ হয় না। পরিশ্রম, ভাগ্য, টাইমিং এসবও ফ্যাক্ট করে। তো সেই বন্ধুর অবস্হান আর নিজের অবস্থান কম্পেয়ার করে ডিপ্রেসড হতে পারেন। আবার নিজের সোনালি অতীত ও ধূসর বর্তমানের মধ্যে কম্পেয়ার করে অনেকে ডিপ্রেসড হয়ে যান।
 
একটা কথা শুধু মনে রাখবেন। আপনি যে অবস্হানে আছেন তারচে অনেক খারাপ অবস্হায় অনেক মানুষ এই পৃথিবীতে আছে। একদিন কোন সরকারি হাসপাতাল থেকে ঘুরে আসবেন। কত মানুষ কত রকমের অসুখ নিয়ে অসহায় হয়ে পড়ে আছেন। তাদের অবস্হার সাথে নিজেকে তুলনা করেন। কি ডিপ্রেসড লাগছে এখনো?
 
লাগার কথা না। তাও যদি লাগে ১০ টাকা দিয়ে সরকারি টিকিট কেটে মানসিক ডাক্তার দেখান।
 
তৃতীয়ত, সীমাবদ্ধতা থেকে তৈরি ডিপ্রেশন। আপনার হাইট ৪ফুট ৫ ইন্চি। কিন্তু আপনার ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন পর্দা কাপানো নায়ক হবেন। কিংবা আপনি ভালো ক্রিকেট খেলেন অথবা ছবি আঁকেন কিংবা লেখালেখি করেন কিংবা রাজনীতি করেন। কিন্তু পরিবার সাপোর্ট করে না।
আচ্ছা, আগে চিহ্নিত করুন সীমাবদ্ধতা কোন জায়গায়। আপনার কি সাধ্য আছে সেটা ওভারকাম করার? আপনি কি সেই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সাকসেস পাবেন। ধরুন, ক্রিকেট খেলার নেশায় আপনি পড়ালেখা, পারিবারিক বাঁধা সব ঝেড়ে ফেললেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আপনি কি ১০০% কনফিডেন্ট যে ক্রিকেটে লেগে থাকলে আপনি একদিন সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবেন?
যদি আপনি মনে করেন আপনি পারবেন, তাহলে সীমাবদ্ধতা নিয়ে ডিপ্রেশনে না ভুগে একক সিদ্ধান্তে আগানো উচিত। আর তা না হলে সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই নতুন এইম সেট করে কাজে লেগে পড়ুন। ডিপ্রেশন চলে যাবে।
২. প্রতিদিন এক্সারসাইজ করলে মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বাড়ে। যা সেরোটোনিন ক্ষরণ বাড়ায়। তাই প্রতিদিন ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করুন। দৈনিক ৩০ মিনিট করে হাঁটা শুরু করুন। এক সপ্তাহে ডিপ্রেশন অর্ধেক কমে যাবে।
 
৩. আমাদের শরীর ও মনের মধ্যে একটা অপূর্ব সমন্বয় বিদ্যমান। আপনি যখন আনন্দিত থাকেন, ফ্রেশ থাকেন আপনার শরীর এনার্জিতে ভরপুর মনে হয়। অটোমেটিক আপনার বডি ল্যাংগুয়েজে একটা চার্ম প্রকাশ পায়। কিন্তু ডিপ্রেশনের সময় আপনার ঘাড় কুজো হয়ে যায়। গালে হাত দিয়ে বসে পড়েন। উদাস হয়ে পড়েন।
আপনি যখনি বুঝবেন আপনার মনে ডিপ্রেশন কাজ করছে, আপনি হয়তো সাথে সাথে মনকে কন্ট্রোল করতে পারবেন না। কিন্তু আপনি আপনার শরীরকে তো কন্ট্রোল করতে পারবেন। আপনার বডি ল্যাংগুয়েজ চেন্জ করে ফেলুন। কুঁজো ঘাড় সোজা করুন। গাল থেকে হাত সরান। শরীরটা এ্যালার্ট করুন। তাহলে আমাদের ব্রেনে যখন আমাদের মাইন্ড ও বডি থেকে ২টা ডিফারেন্ট সিগন্যাল যাবে তখন শরীরের সাথে মনের সমন্বয় করতে গিয়ে ডিপ্রেশন কমে যাবে।
 
৪. প্রতিদিন সূর্যালোকে সময় কাটাবেন। সূর্যের আলোতে ভিটামিন D থাকে। যা ডিপ্রেশন দূর করতে খুব কার্যকর। এছাড়া আমাদের শরীরে সময় অনুযায়ী বিভিন্ন হরমোন ক্ষরণ হয়। যেমন,রাতে আমাদের ঘুমের সহায়ক হরমোন নিসৃত হয়। খাওয়ার পর বিশ্রাম সহায়ক। আপনি সূর্যালোকের বাইরে দীর্ঘসময় থাকলে শরীরের সময় বুঝতে সমস্যা হয়। ফলে হরমোন ক্ষরণে ধারাবাহিকতা থাকে না। এটা আপনার ডিপ্রেশনের কারণ হতে পারে।
 
৫. মনে করেন আপনি খুব বড় একট অকাজ করে রীতিমত ফেঁসে গেছেন। চারদিকে ছি ছি করছে। কিংবা আপনার হওয়ার কথা ছিল ফার্স্ট আর আপনি করলেন ৩ পেপারে ফেল। প্রেস্টিজ বলতে কিছু নাই আর। আপনি সম্পূর্ণ ডিপ্রেসড। এরকম পরিস্হিতিতে আপনার কাজ হচ্ছে জনসাধারণের আড়ালে থাকা যতক্ষণ না ঘটনাটা চাপা পড়ছে। তা নাহলে জনগণ আপনাকে খুচিয়ে খুচিয়ে ডিপ্রেশনের শেষ ধাপে নিয়ে যাবে। বাংলাদেশের জনগণ এই কাজে খুবই পটু।
 
৬. ডিপ্রেশন থেকে বের হতে হাওয়া বদল করুন। সিংগাপুর,মরিসাস যেতে হবে এমন কোন কথা নাই। আসপাশের কোন সুন্দর জায়গা থেকেই ঘুরে আসুন কয়েকদিনের জন্য।
 
৭. নিজেকে ক্রিয়েটিভ কাজে ইনভলব রাখুন।দেখবেন ডিপ্রেশন কোথায় হারিয়ে যাবে।
 
৮. ইন্টারনেটে চ্যাটিং আপনাকে অপর প্রান্তের মানুষের আবেগ বুঝতে এবং অন্যকে আপনার ইমোশন বুঝাতে সহায়ক নয়। সরাসরি ফেস টু ফেস যোগাযোগ করার চেস্টা করুন। অতিরিক্ত অনলাইন কমিউনিকেশন স্ট্রেস বাড়ায় এবং ডিপ্রেশন তৈরি করে।
 
৯. যত বেশি পারবেন দুঃখের গান,স্মৃতি,মুভি এগুলো ডিপ্রেসড থাকা অবস্হায় এড়িয়ে যান।
 
অতীত মৃত লাশের মত। কবর না দিলে দূর্গন্ধ ছড়াবে।
 
১০. আপনি যদি মনে করেন আপনার পক্ষে নিজে থেকে ডিপ্রেশন কাটানো সম্ভব না তাহলে মনোচিকিৎসক বা মনোবিদের শরণাপন্ন হয়ে প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ, সাইকোথেরাপি, কাউন্সেলিং সেবা নিতে পারেন ।
 
তবে কখনোই নেশাদ্রব্য ডিপ্রেশনের সমাধান হতে পারে না। এটা সাময়িক একটা ভালো লাগা উদ্রেক করে কিন্তু আলটিমেটলি আপনাকে আরো বড় ডিপ্রেশনের দিকে ঠেলে দিবে।
 
ডিপ্রেশন ঝেড়ে ফেলে চাঙা হয়ে উঠুন। জানান কতটুকু হেল্প করল আমার টিপসগুলো। আর এমন আরো টিপস পেতে থাকুন অবাধের সাথেই।
ধন্যবাদ।